তারপদ দাদুর গল্পঃ
অবিভক্ত বাংলায় তখন জমিদারি শাস্বন চলত । তিন জমিদার এর সন্তান সদেবেন সরকার, রাজারাম, শিশির গাঙ্গুলী এরা শৈশবকাল থেকেই খুব ভালো বন্ধু । তারা ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠে । দেবেন সরকার ও শিশির গাঙ্গুলী দুজনেই বিয়ে করে নেয় । কিন্তু রাজারাম বিয়ে করে না । দু'বছর এর মধ্যে দেবেন সরকার এর একটি সুন্দর ছেলে ও শিশির গাঙ্গুলীর একটি সুন্দরী মেয়ে হয় । রাজারাম এই দুই শিশুর বিয়ে পাকা করে রাখে। ছোট বেলায় শিশির তার মেয়েকে বিলেতে পাঠায় । সবাই খুব খুশীতেই দিন কাঁটাচ্ছিলো, একদিন রাজারাম মারা যায়। মৃত্যু আগে তার জমিদারি দেবেন এর হাতে দিয়ে গ্রামের লোকজনের জন্য কিছু করতে বলছিল। দেবেন সরকার তার বাড়িটা বাদে তার ও রাজারাম এর সব সম্পত্তি দিয়ে গ্রামের লোকের জন্য বড় একটা হাসপাতাল তৈরি করেন । হাসপাতাল টির নাম দেয় '' রাজারাম হাসপাতাল'' ।
আশেপাশের গ্রামের লোকজন ও খুব খূশী হয় । সবাই সুখেই ছিল একদিন এই সব খুশী হারিয়ে গেল । এক ঝড়ো দিনে শিশির গাঙ্গুলী ও দেবেন সরকার এর বজ্রাঘাত এ মৃত্যু হয় । খবর পেয়ে লক্ষী বিলেত থেকে বাড়ি আসে ।
ওদিকে দেবেন সরকার এর ছেলে নিখিল একা হয়ে পড়ে ।
নিখিল মা , তার স্বামীর মৃত্যুর কথা শুনে প্রবল ভাবে অশূস্থ হয়ে তিন দিন পর মারা যায় । নিখিল ও লক্ষী তাদের বিয়ে
হওয়ার শর্ত জানত । কিন্তু তারা বড় খুব একটা বড় হয়ে ওঠে নি । তাই লক্ষ্মীকে আবার বিলেতে পাঠানো হয় উচ্চ শিক্ষার জন্য । অন্য দিকে নিখিল তার অবশিষ্ট সম্পত্তি বিক্রি করে বিলেতে চলে যায় । তারপর নিখিল এর ব্যাপারে কোন খবর পাইনি গ্রামের লোকজন । ৮ বছর পর লক্ষ্মী গ্রামে একটা স্কুল খোলে ও ওখানেই বাচ্চাদের পড়িয়ে দিন কাটায় । লক্ষ্মীর ২২ বছর বয়স এখনো সে বিয়ে করে নি ।কারন নিখিল এর কোন খোঁজ ছিল না। গ্রামে হাসপাতাল থাকলেও ভালো ডাক্তার ছিল না । দেবেন নামে এক সুদর্শন যুবক লক্ষ্মীর মায়ের কাছে হাসপাতালে ডাক্তারি চাকরির জন্য আসে । লক্ষ্মীর মা ভাবলো এই যুবক খুব সুন্দর ও তার
মেয়ে তো সুন্দরী কোন ভাবে যদি এদের বিয়ে দেওয়া যায় । এটা ভেবেই তিনি দেবেন কে ওনার বাড়িতেই রাখে ও চাকরিটা পাকা করে দেয় । দেবেন তৈরি হয়ে হাসপাতালে যাবে তখনই লক্ষ্মীর সাথে দেখা । দুজনি একেঅপরের দিকে কিছুক্ষন একনজরে তাকিয়েই থাকল । লক্ষ্মীর মা ব্যাপার টা দেখে খুব খুশি হয়। তিনি বলেন দেবেন একজন ডাক্তার আজি আমাদের হাসপাতালে চাকরি নিয়েছে । তোমার সাথেই নিয়ে যাও । লক্ষ্মী রাজি হল ও দুজনি নিয়মিত একসাথে আসে যায় । দেবেন কিছু দিনের মধ্যেই প্রচুর নাম অর্জন করে । দূর দূর থেকে অসুস্থ মানুষ "রাজারাম হাসপাতাল'' আসে । সবাই সুস্থ হয়েই বাড়িতে ফিরত । এক বছরের মধ্যেই দেবেন সম্পূর্ন দেশের মধ্যে সব থেকে বড় ডাক্তার হয়ে ওঠে । আর " রাজারাম হাসপাতাল'' এর নাম পুরো দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে । বিলেত থেকে বড় বড় ডাক্তার "রাজারাম হাসপাতাল'' কে পুরস্কৃত করতে আসে । তারা ঠিক করে রাজারাম এর জন্ম তারিখ এ আনুষ্ঠানিক ভাবে পুরস্কৃত করবে । ডাক্তারদের লক্ষ্মী দের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করা হল । দেবেন অন্যান্য হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করার জন্য লক্ষ্মী দের বাড়ি আসতে পারে নি । দেবেন ঠিক করে অনুষ্ঠানের দিন আসবে। অন্য দিকে বিলেতের ডাক্তাররা একটা ঘরে দেবেন এর ছবি দেখে, লক্ষ্মী ও তার মাকে জিজ্ঞেস করে ওটা কার ছবি দুজনেই বল ওটা আমাদের ডাক্তার দেবেন এর ছবি । লক্ষ্মী ওনাদের বিস্ময় দেখে জিজ্ঞেস করে আপনারা কি ওনাকে চেনেন । সবাই হ্যা কিন্তু দেবেন কে না ওনার মতোই দেখতে যার খ্যাতি পুরো ইংল্যান্ড এ ছড়িয়ে আছে । বিখ্যাত ডাক্তার হিসেবে । তিনি ওই অল্প বয়সেই সব ডাক্তারদের থেকে শ্রেয় হয়ে ওঠে। তিনি চিকিৎসা করতেন না । বড় বড় ডাক্তারদের শিখাতেন । অনেক দিন তার কোনো খবর নেই ।
ওই ডাক্তারের কথা শুনে লক্ষ্মী ও তার মায়ের ও একটু ভালো লাগলো ।এ কয়েক দিন ডাক্তাররা গ্রামের পরিবেশ অনুভব করল । রাজারাম এর জন্ম দিবস এ দেবেন অনুষ্ঠিত মঞে উপস্থিত হয় ।মঞে উপস্থিত সব বড় ডাক্তাররা দেবেন কে স্যার বলে সম্বোধন করে আপ্যায়ন করে । ডাক্তারদের বিষ্ময় দেখে সবাই বিষ্মীত । বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট মিস্টার জন দেবেন এর বন্ধু । তিনি রাজারাম এর সমন্ধে কিছু কথা বলে ।সবার কৌতূহল দেখে তিনি দেবেন এর ব্যাপারে বলেন যে দেবেন তার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে। কিন্তু তিনি এখনো তার বাবার একটা স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি । ওনার বাবা চেয়েছিলেন যে আপনাদের লক্ষ্মীর সাথে ওনার বিয়ে হোক । আপনারা কিছুই বুঝতে পারলে না তো । দেবেন আর কেউ না আপনাদের দেবেন সরকার এর ছেলে নিখিল সরকার । এটা শুনে লক্ষ্মী অঙ্গান । তিনি বলেন নিখিল এর বাবা চেয়েছিলেন গ্রামে ভালো হাসপাতাল হোক । হাসপাতাল হলেও এখানে ভালো ডাক্তার রেখে যেতে পারেন নি । তাই তিনি বিলেতে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে ইংল্যান্ড তথা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডাক্তার হয়ে ওঠে । নিখিল লক্ষ্মীকে বিয়ে করতে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা বদলাতে এখানে আসে । কিন্তু তিনি সবার কাছে তার বাবার নাম দেবেন হিসেবে পরিচিত
হওয়ায় । আমারাও ওনার খবর জানতে পারিনি যেমন আপনারাও চিনতে পারেন নি। লক্ষ্মীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় । ঙ্গান আসতেই নিখিলের দিকে রাগ মুখে তাকালেও কিছুদিনের মধ্যেই তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে লোকজন এর উপকার করে শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করেন।
সুজন বারুই